৫৭ ধারা: মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ

এক সময় যা টুকটাক লেখালিখির মাধ্যম ছিল প্রিয় ডায়েরি, আজ তা ফেইসবুক বা ওয়ার্ড প্রেসের মত উন্মুক্ত প্লাটফর্মের দখলে। তাই স্বাভাবিকভাবেই, আমাদের অভ্যাসগুলোতে আমল পরিবর্তন এসেছে। আগে অভিমত ব্যক্ত হত গোপনে, এখন তা অনেকটা প্রশংসা পাওয়ার লক্ষ্যেই খোলামেলা প্রকাশ পায়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো একজনকে বাঁধাইহীন সুযোগ দিয়েছে। যে কেউ তার মনের তাত্ক্ষণিক ভাব প্রকাশ করে ফেইসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে। তবে যেখানে এমন অপার স্বাধীনতা বিদ্যমান, সেখানে শৃঙ্খলা বজানোর স্বার্থে আইনের হস্তক্ষেপ আবশ্যক। কথা বলছি বাংলাদেশের প্রথম প্রযুক্তি ভিত্তিক আইন ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬’ এর ৫৭ ধারা নিয়ে।

৫৭ ধারার আলকে, ইলেকট্রনিক মাধ্যমে মিথ্যা, অশ্লীল বা মানহানিকর তথ্য প্রকাশ একটি অপরাধ। যদি কেউ কোন ওয়েবসাইটে বা যেকোন ইলেকট্রনিক মাধ্যমে কোন মিথ্যা বা অশ্লিল কিছু প্রকাশ করে, যার কারনে কারো ভাবমূর্তি নষ্ট হয় তাহলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গন্য হবে।

উদাহরণ হিসেবে, আজ ‘লিগালি বাঙালি’ ব্লগে আমি এমন কিছু লেখলাম, যা সরাসরি কোন ব্যক্তির সম্মানহানি করেছে। অথবা কোন ছবি বা লেখা পোস্ট দেওয়া হয়েছে যা অশ্লীল। এমন পোস্ট ৫৭ ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এবং শাস্তি হিসেবে এই আইন লঙ্ঘনকারি কে অনধিক ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং অনধিক ১ কোটি টাকা জরিমানা দেওয়ার আহ্বান করা হবে।

অবাক হলেন? যে কেমনে একটি স্ট্যাটাস বা পোস্ট আপনার পুরো জীবন টা অলট পালট করে ফেলতে পারে? ছোট ঘটনা বিশাল আকার ধারণ করতে সময় লাগেনা। এই ধারা তে আরো কিছু কে অপরাধ হিসেবে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, যেমন একটি পোস্টের দ্বারা যদি আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে, বা কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত আনে বা যে পোস্ট এ কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি। সুতরাং ৫৭ ধারার অধীনে আপনার সামান্য একটি ফেইসবুক পোস্ট আপনাকে বিপাকে ফেলতে পারে।

ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার আগে যা বিবেচনা করতে হবে:
১. আপনি যা লেখবেন তা অবশ্যই অন্যকোন ব্যক্তির দিকে ইংগিত করবেনা। এমন কিছু লেখবেন না যা নিতান্তই অপমানকর এবং সমাজে তার সম্মান ক্ষুণ্ণ করতে সক্ষম।

২. এমন পোস্ট দিবেন না যেটাতে অশ্লিল ছবি বা কথাবার্তা আছে যা সরাসরি কারো ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত করতে পারে। আজকাল এমন অভ্যাস অনেকের মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যে ‘ফেইক প্রোফাইল’ এর পিছনে কিছু মানুষ এমন সব পোস্ট করছে, একধরনের অরাজকতা সৃষ্টি করার জন্য।

৩. এমন কোন কিছু লিখবেননা যা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এমন বক্তব্য যা সমাজ ব্যবস্থার অবনতি ডেকে আনে।

আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এবং এমন ভাবাটাই স্বাভাবিক, যে এত সব সীমাবদ্ধতার মাঝে আমাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা চাপা পড়ে যাচ্ছে। এবং এটাও সত্য যে, আইন তৈরি হয় জনগণের অধিকারের কথা মাথায় রেখে। যে আইন মানুষকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, সে আইন কখনোই গ্রহণযোগ্যতা পাবেনা।

অন্য দশটা আইনের মত, ২০০৬ সালের এই আইনকেও কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে সবার একই অভিযোগ, ৫৭ ধারা একজন নাগরিককে তার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে।

বাংলাদেশ সংবিধান তার ৩৯ ধারা দ্বারা এ দেশের প্রত্যেকক নাগরিকের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। সে অনুযায়ী ইন্টারনেটে নিজের মত ব্যক্ত করায় বাধা প্রদান সংবিধান পরিপন্থী। এই একই সংবিধানের ২৬ ধারায় বলা হয়েছে মৌলিক অধিকারের সহিত অসমঞ্জস আইন বাতিল। সুতরাং সংবিধান মতে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বাতিলযোগ্য।

তথ্যপ্রযুক্তির যুগে অপরাধের ধরণটাও ভিন্ন। তাই বলে ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ১ কোটি টাকা জরিমানা আমার আনুপাতিক বলে মনে হয়না।
এমন শাস্তির বিধানটি অবিলম্বে লাঘব করা জরুরি। ‘ফেইক প্রফাইল’ এর ফাঁদে অনেককেই শিকার হতে হচ্ছে ভুল অভিযোগের। তাদের অধিকার বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।

৫৭ ধারায় কোন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মিথ্যা বক্তব্য অপরাধ হিসেবে গন্য হবে। এমন কোন প্রতিষ্ঠান, হোক তা বেসরকারি বা রাজনৈতিক, যদি কোন অন্যায় করে থাকে এবং তার কারনে কেউ ক্ষতিসাধন করে থাকে, আমি মনে করিনা তাকে এ বিষয়ে কথা বলতে বাধা দেয়া উচিত।

সবশেষে এই বলতে চাই যে, আপনার বেপরোয়া লেখার কারনে যা অমার্জনীয় প্রভাব পড়তে পারে সমাজে, তা ভেবে দেখার বিষয়। আপনার সামান্যতম একটি পোস্ট পারিবারিক দ্বন্দ্ব থেকে শুরু করে এমনকি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণ হতে পারে। তাই সমাজের ভারসাম্য রক্ষার্থে এমন আইন হতে পারে ফলপ্রসূ।

Advertisements